যা দেখেছি যা বুঝেছি—১৫ || মনিরুল ইসলাম || মানবজন্মদিবস
৫৩ কোটি বছর আগে থেকে অধিংকাংশ সামুদ্রিক জলজ প্রাণী তথা মাছ ক্রমান্বয়ে স্থলে উঠে আসতে শুরু করল। তারপর এল উন্নততর উভচর ও স্থলচর প্রাণীÑডিম ও বাচ্চা দেয়া প্রাণী, বীজ দেয়া বৃক্ষলতা। ৬ কোটি বছর পূর্ব পর্যন্ত পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়া ও কমা এবং অন্যান্য মহাজাগতিক কারণে অনেক বৃক্ষ—লতা—প্রাণীর সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটল, যেমন ডাইনোসর। এ সময়কার মহাবিলুপ্তি থেকে রক্ষা পাওয়া কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী বৃক্ষবাসী প্রাইমেটে পরিণত হয়, যার কয়েকটি উন্নত ধারা বিভিন্ন ‘হোমো’ রূপে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকাতে যথাক্রমে ৩, ২, ১.৫ লক্ষ এবং ৬০ ও ৩০ হাজার বছর পূর্ব পর্যন্ত স্বতন্ত্রভাবে বেঁচে ছিল।
১.৪ কোটি বছর আগে হিউমিনিড বা গ্রেট এপস্ জাতি ৪টি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে: শিম্পাঞ্জি, গরিলা, হিউমেন ও ওরানগুটান। আধুনিক মানুষের সর্বাধিক নিকটবর্তী প্রাণী শিম্পাঞ্জির যাত্রা শুরু ৫০ লক্ষ বছর আগে। প্রাইমেট জাতির একটি শাখা প্রায় ৬০ লক্ষ বছর বির্বতনের পর বড়মগজ ও দ্বিপদী খাঁড়া স্বতন্ত্র প্রাণী হিসাবে বিকশিত হতে থাকে, যাকে পরবর্তীতে আমরা ‘জেনাস হুমো’ বা ‘মনুষ্যজাতি’ বলা শুরু করেছি। বিবর্তনকালে আদিমানুষ প্রজাতির অনেক শাখাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যার শেষচিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে রাশিয়া, স্পেন, ইটালি, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া, কেনিয়া প্রভৃতি দেশে। তবে কালের বিবর্তনে আধুনিক শিম্পাঞ্জি ও মানুষের পূর্বসূত্র ধরে শেষ পর্যন্ত তাদের শুধু একটি ধারা/প্রজাতি ‘হুমো সেপিয়েন্স’ নামে টিকে রইল আফ্রিকার মাটিতে। এদেরই উত্তরপুরুষ আমি, আপনি, হয়ত সবাই।
হোমো সেপিয়েন্স তথা দৈহিকভাবে আধুনিক মানুষ এই গ্রহে ২.৫ লক্ষ বছর থেকে বসবাস করলেও তারা তাদের ইতিহাসের ৯০% সময়ই ক্ষুদ্র গ্রুপে যাযাবর শিকারী—সংগ্রাহক হিসাবে কাটিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মানুষের ইতিহাস অনেক সংক্ষিপ্ত। লক্ষাধিক বছর আগে আদি প্রস্তর যুগে মানুষ যখন টুল ব্যবহার শুরু করে এবং শিকার করতে শেখে, সেই থেকে সূচিত হল মানুষের ইতিহাস। বিভিন্ন ধাপে ক্রমোন্নতির মাধ্যমে বুদ্ধির দ্রুতবিকাশ শুরু হলে ৫০ হাজার বছর পূর্বে নব্য প্রস্তর যুগে এই প্রাণীটি ব্যবহারিকভাবে ‘আধুুনিক’ হয় অর্থাৎ আগুন, রান্না ও ভাষা ব্যবহার এবং সামাজিক বন্ধন সৃষ্টি করতে শেখে। তারপর থেকে জৈবিক বিবর্তনকে পেছনে ফেলে সামাজিক—সাংস্কৃতিক বিবর্তন বাড়তে থাকে। মানুষ বুুদ্ধিবৃত্তিগতভাবে ‘আধুনিক’ হতে থাকে।
৬০ হাজার বছর আগে ‘হর্ন অব আফ্রিকা’ তথা ইরিত্রিয়া, জিবুুতি ও সোমালিয়া হয়ে একদল মানুষ দক্ষিণপূর্ব এশিয়া ও ওসানিয়াতে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদল মিশরের সিনাই উপদ্বীপ দিয়ে বেরিয়ে এসে এশিয়া—ইউরেশিয়ায় বসতি স্থাপন করে। প্রায় ১৫ হাজার আগে হোমো সেপিয়েন্স জাতি সকল মহাদেশে বসতি স্থাপন করে সর্বশেষ সাইবেরিয়ার বেরিং প্রণালী দিয়ে উত্তর আমেরিকা ও পরে ১১ হাজার বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় এসে পেঁৗছে। সুতরাং আফ্রিকায় আবির্ভূত হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির মনুষ্যপ্রাণীই আজ পৃথিবীর সর্বত্র রাজত্ব করছে, অন্য প্রজাতির ‘মানুষ’ মহাকালে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১২ হাজার বছর পূর্বে কৃষিকাজ শুরুর মধ্য দিয়ে যখন প্রথম সভ্যতার উদ্ভব হল, তখনই বরফমুক্ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল মানুষ। বাঙালি কবি কি এজন্যই বলেছিলেন, নানান বরণ গাভীরে ভাই একই বরণ দুধ/ জগৎ ভরমিয়া দেখলাম একই মায়ের পুত।
রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগে ১০ থেকে ৩ হাজার খ্রিস্টপূর্ব সময়ে মানবজাতি একতাবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করে। টাইগ্রিস—ইউফ্রেটিস নদীর তীরে ‘ফার্টাইল ক্রিসেন্ট’ মেসোপোটেমিয়াতে খ্রি.পূর্ব ৭,০০০—৪,৫০০ সালে মানুষ কৃষিকাজ, পশুপালন ও বৃক্ষরোপণ দ্বারা স্থায়ী মানববসতি শুরু করে। খ্রি.পূর্ব ৩,৫০০ সালে নীলনদের তীরে মিশরীয়, খ্রি.পূর্ব ৩,৩০০ সালে সিন্ধুনদের তীরে হরপ্পা—মহেঞ্জোদাড়ো এবং ইয়াংসি—ইয়ালো নদীর উপকূলে চীনা সভ্যতা গড়ে ওঠে। ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকায় মানবসমাজ গড়ে ওঠে, যেমন: মধ্য মেক্সিকো, পাপুয়া নিউগিনি, পেরু, সাব—সাহারা, মিসিসিপি, রোমান, এজিয়ান (গ্রীস) ইত্যাদি। ঐক্যবদ্ধ মানবগোষ্ঠীর পারস্পরিক সহযোগিতায় শুরু হয় নগরায়ন, বাণিজ্যিকরণ, লেখন, সংস্কৃতি ও ধর্মের প্রসার। খ্রি.পূর্ব ৬০০ সালের পর থেকে ইরানে জরাথুস্ত্র, চীনে কনফুসিয়াস এবং তাও, ভারতে বুদ্ধ এবং জৈন, মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদি এবং গ্রীসে দার্শনিকবৃন্দের আবির্ভাব ঘটে। মানুষ এককভাবে জয় করতে শুরু করে পৃথিবী।
উৎসভূমিতে একাকী বসে আজ ভাবছি: ৪৫৪ কোটি বছরের পুরনো পৃথিবীতে ২.৫ লক্ষ বছরের পুরনো মানুষ কোথা থেকে এসে কোথায় পেঁৗছল? টুল ব্যবহার, আগুন ও ধাতব জিনিস আবিষ্কার, ভাষার বিকাশ, কৃষিকাজ ও পশুপালন, সমুদ্র বিহার এবং সর্বশেষ শিল্প—বিপ্লব প্রাণীজগতের একটি প্রজাতি ‘হোমো সেপিয়েন্স’কে বর্তমান পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। হাসি পায় মানবজন্মের ইতিহাস জেনে। মানুষ তো দেখি আদি থেকেই বসন্তের কোকিল, পৃথিবীর সব ঠিকঠাক হওয়ার পর তার রাজসিক আগমন এবং দ্রুত তার বিশ্বজয়!
কিন্তু ধর্ম কী বলে? পৃথিবীতে যে ৪,২০০ ধরনের ধর্মমত রয়েছে, তাদের কেউ বলে না যে মানবজন্ম প্রাকৃতিক নির্বাচন, যোগ্যতমের বিজয় ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে হয়েছে। মহাবিশ্ব ও মানব সৃষ্টির ব্যাপারে মোটামুটি প্রত্যেক ধর্মেরই নিজস্ব কিছু মতামত রয়েছে। যেমন পৃথিবীর ৫৫% মানুষের ধর্মবিশ্বাস আব্রাহামিক (ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম) মতে ¯্রষ্টার সৃষ্ট প্রথম মানুষ হল মাটির তৈরি ‘আদম’, যার পাজর থেকে পরে হল ‘হাওয়া’। তারা শয়তানের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ ফল খেয়ে স্বর্গচ্যুৎ হয়ে পৃথিবীতে বসবাস শুরু করেন এবং তাদের সন্তানাদি থেকেই আজকের মানবজাতি। ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মমতে ঈশ্বর ৬ দিনে পৃথিবী সৃষ্টি করতে গিয়ে সবশেষে মানুষ সৃষ্টি করলেন এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। খ্রিস্টান মতে যিশু তথা মানুষ ঈশ্বরেরই সন্তান, ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশ করার জন্যই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। ইসলামী মতে আদম—হাওয়া তথা মানবজাতি পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে তার মহিমা প্রচার ও স্বর্গ প্রার্থনা করবে।
বিশ্ব জনসংখ্যার ২১% হল হিন্দু এবং বৌদ্ধ। তাদের বিশ্বাস মতে সতত পরিবর্তনশীল ‘মহাবিশ্ব ও প্রাণী’ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব প্রভৃতি মহাদেবতার মাধ্যমে ‘সৃষ্টি—ধ্বংস—পুনঃসৃষ্টি’ এই চক্রাকার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আদি হিন্দুশাস্ত্রে কোটি কোটি বছর পূর্বে পূর্ণমানব সৃষ্টির কথা থাকলেও উপনিষদে প্রথমে আত্মা, পরে প্রাণ বায়ু ইন্দ্রিয় বৃক্ষ মন ইত্যাদি সৃষ্টির কথা বর্ণিত রয়েছে। তবে বিজ্ঞান আর ধর্ম যদি চলে বিপরীতমুখী, একজন আধুনিক যুক্তিবাদী মানুষ কিভাবে জগতে নিজেকে উপস্থাপন করবে? তার নানাবিধ বিকল্প আছে: হয় সে যেকোনো একটিতে গেঁাড়া বিশ্বাসী হবে, কেউ গোজামিল দিয়ে দুটোতেই বিশ্বাস করবে, হয়ত ধর্মচিন্তা করবে না, নয়তো নাস্তিক হবে।
আজকাল নিজেকে প্রশ্ন করি: আমি তাহলে কোথায় আছিÑবিজ্ঞানে, না—কি ধর্মবিশ্বাসে? কখনো না বুঝে, কখনো বেশি বুঝে বা না—বুঝার ভান করে দুটোতেই আস্থা রাখি। বিজ্ঞান এবং ধর্ম দুটোতেই জিজ্ঞাসা প্রবল, কাউকেই নাখোশ করতে চাই না, উভয়কেই ধরে রাখতে চাই। তাই একদিকে বিজ্ঞান পড়ি, অন্যদিকে ধর্মকর্ম করি। কী দুর্বোধ্য বৈপরীত্যের সহাবস্থান মানবচরিত্রে! এই বৈপরীত্য দূর করতে পারবে না। কারণ, আধুনিক মানুষ কয়েকবার কয়েকধরনের জন্মলাভ করে। জৈবিক দৈহিক জন্মলাভের পর টিকে থাকার প্রতিযোগিতামূলক সংগ্রামে প্রথমেই সে বাস্তবতায় জন্মলাভ করে। সে বুঝতে পারে নিখাদ সত্য—ন্যায়—সততা দিয়ে কাজ হবে না, তাকে সময় বুঝে আপোষের কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
