ফেরদৌস সাজেদীনের হৃদ—গদ্যঃ ছড়িয়ে রই জোছনা করেছে আড়ি
যৌবনে বাংলাদেশের অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। মৌন মন নিয়ে, অনেকটা বাউলের মত। সেসব ঘোরাফেরা অপরিমেয় নয়, আবার অপ্রতুলও নয়। পালের হাওয়া পেয়ে সে—সব চলা কখনও দৌড়ে দৌড়ে ছিল না, ছিল গুন টেনে টেনে, পা পা ফেলে ফেলে, ধীরে ধীরে। আজ মনে হয়, এই যে এত টান আমি আজো দেশের জন্য অন্তরে অথই করে রেখেছি, তার কারণ মনে হয়, সেই সব সময়ে, দেশের রূপ—রস—গন্ধ দেখামাত্রই চুক চুক পান করেও, আমি বিলম্বিত কিছু সময়, অনিয়ন্ত্রিত কিছু সময় ব্যয় করেছি আমার দৃষ্টিপাতে; বিচিত্রতার সৌন্দর্য আকন্ঠ পান করেছি নেশার আনন্দেÑ আর সেই মনে গেঁথে যাওয়া চিত্রাবলীই দিনে দিনে অনিমেষ আমাকে আজো ডাকে, আয় আয় আমার বুকে আয়! এই—ই কী টান, মায়ার—ই টান! এই—ই কী তবে মৃত্তিকা ও মন!
এত যে ঘুরেছি, ছুটিতে, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে, বন্ধুত্বের দাস হয়ে, তারপরেও যাব যাব করে, নানা কারণে কখনই যাওয়া হয়নি কিছু কিছু জায়গায়! গেল বছর দেশে গিয়ে যথারীতি বেশ কয়েকটি জায়গায় গিয়েছি। কিন্তু তবুও, আহ্বান যে জায়গার প্রশ্নাতীতভাবে যৌবনকাল থেকেই জাদুমন্ত্রগ্রস্থ, সেখানে আমার শেষপর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। হাতে গুনে কয়েকটি দিনের জন্য দেশে যাওয়া, অনেক কিছুই করব বলে পণ করি, কিন্তু ফেরার সময় দেখি এটা করিনি ওটা করিনি, বাকি রয়ে গেছে অনেক কিছুই। এখন প্রায় প্রবাদ হয়ে গেছে যে, ঢাকায় দিনে একটির বেশি দুটি কাজ সম্পন্ন করা দুরূহ। এর বড় কারণ শহরের যানজট। আর শহরের এ—মাথা থেকে ও—মাথা হলে তো কথাই নেই, হাতের একটিমাত্র কাজও শেষ হয়না। কেবল অযথা সময় ক্ষয় হয়।
তবুও বাসায় ফিরে, যানজট বলি, ধুলো বলি, মানুষের হল্লা বলি, মিছিল বলি, এত বছর পরেও আমার কাছে সবই বিস্ময়ের মত লাগে; কিছুই বিপন্ন নয়, সবই আপন লাগে। তারপরেও দেশ থেকে ফিরে আসার সময় যখন চাওয়া অপূর্ণ থেকে যায় তখন ঢুঢু বুকের বিরহ—জ্বালা আরও জখম হয়। আমার সারা জীবনের শহর নিউইয়র্কে ফিরে এসে, আবারও শুনি আমার অন্তরে কুজন করছে কীর্তনÑসেই স্থানের, সেই অদৃশ্যের, যা আজো উন্মোচনের অপেক্ষায়। আমি যাব, আমাকে যেতেই হবে! আর এই পারাপারের পালা চলছে বছরের পর বছর, যেন অন্তহীন!
হঠাৎ এবছর, আর তা অস্ফুট রইলনা। অসামান্য ছোঁয়া পেল আমার আর্তি; আমার ছোটভাই নিজেই সব আয়োজন শেষ করে বলল, সঙ্গে ছোটমামা আর তার এক বন্ধুও যাবে, আমরা চারজন। শুনেই আমার চিত্ত দীপ্তি ছড়ালো। আমরা পরশু যাব। এই যাত্রার ভাবনা বীজ বুনেছিল কত কত বছর আগে! যুগ যুগ আগে!
আবুল হাসান তখন কবিতা লিখছেন। তিনি কবিতায় নিমগ্ন সর্বক্ষণ। তিনি যা ভাবেন, তিনি যা বলেন, যা দেখেন তার সবই অস্পষ্টতায় স্পষ্ট, আলোর আড়ালে এক আবছায়া, যেন, আঁধারের বেশি আলো বা আলোর বেশি আলো—আঁধার। কবিতা, একমাত্র কবিতাই তখন তাঁকে গ্রাস করে আছে। বুদ্ধদেব বসু যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে এক চিঠিতে, হাওয়াই থেকে লিখেছিলেন যে (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখছেন), “সেখানকার প্রকৃতি তাঁকে দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে, অতিশয় গাঢ় রংয়ের আকাশ এবং সুসজ্জিত বৃক্ষরাজি থেকে চোখ ফেরানো যায় না। কিন্তু, তিনি লিখেছিলেন, আমার মুস্কিল হচ্ছে এই যে, এই সব সুন্দর দৃশ্য দেখলেও আমার কোনো কোনো বিখ্যাত কবিতার লাইন মনে পড়ে, আমি ভুলতে পারিনা, বিশ্বসাহিত্যের রত্নরাজি আমার মাথার মধ্যে ভিড় করে আসে। আমি শুধু সাহিত্যের মধ্য দিয়েই সব কিছু উপভোগ করি, এ ছাড়া নিছক সাদা চোখে কিছু দেখার ক্ষমতা আমার চলে গেছে! (এটা তাঁর চিঠির অবিকল ভাষা নয়)।” ঠিক তেমনই, কবিতায় আবুল হাসান এমনই আচ্ছন্ন থাকতেন সবসময়, টেবিলের চেয়ারে বসলেই কাগজের পাতা টেনে নিয়ে অক্ষরের পর অক্ষর সাজাতেন; হাঁটছেন, তখনও সড়কে সড়কে, মানুষে মানুষে, পাতায় পাতায়, আকাশে বাতাসে বা আড্ডার চায়ে, শব্দে শব্দে মর্মগ্রাহী হয়ে উঠছেন। কবিতাতেই তিনি বেঁচে থাকতেন। একদিন আবুল হাসানকে আমি বলি, আমি যেতে চাই আপনার শৈশবের শহরে। আবুল হাসান বাড়িতেও যান না অনেকদিন। কেন, কে জানে! তিনি তখন ঘর ছাড়া, বাড়ি ছাড়া। পুরোপুরি বোহেমিয়ান। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন,
যাবে?
যাবো। জবাবে আমি দৃঢ়তা প্রকাশ করি। তারপর দিন গড়িয়ে যায়, বছর গড়িয়ে যায়, যাওয়া আর হয়না। আমাদের সবার তখন এই স্বপ্ন অই স্বপ্নের ভাঙ্গা—গড়ার দিনকাল। সময়ের ছিটকানি সর্বদা আলগা। সব হবে, আবার কিছুই হয়না দিয়ে আমাদের দিন—রাত্রি মোড়া। একরাতে দেখি, টেবিলের চেয়ারে বসে ঝুঁকে ঝুঁকে তিনি লিখছেন, গোটা গোটা অক্ষরে,
“আমি আবার ফিরে এলাম, আমাকে নাও
ভাঁড়ার ঘরের নুন মরিচ আবার মশলাপাতা গেরুয়া ছাই
আমায় তুমি গ্রহন করো..।” (প্রত্যাবর্তনের সময়)
যৌবনের বিচূর্ণ সময়ে তখন আমাদের সঙ্গ—নিঃসঙ্গতার প্লাবনের নেশা। আমাদের কখনই আর যাওয়া হয়না।
তা সেদিন, আমাদের গাড়ি ঢাকার সন্ধ্যার রাস্তায় পড়ল। আমি গুলিস্তানের মুখে এসে হঠাৎ করেই যেন নিরুপায় ও নিরুদ্দিষ্ট হই। একটু এগুতেই আমার চিরচেনা নবাবপুর রোড অচেনা লাগল। পরিবর্তন কোমরবেঁধে সংকুলান স্থাপন করতে গিয়ে আভিজাত্য হারিয়েছে। মানুষ আর মানুষ। এর মধ্যেই গাড়ি এগুচ্ছে। মানুষ দেখতে আমার সব সময়ই ভাল লাগে, আমার মানুষ দেখায় নেশা জাগে; আজো জাগল, কিন্তু ভিক্টোরিয়া পার্কে এসে গাড়ি থেকে নেমে যখন সামনে এগুচ্ছি, তখন, এই মানুষের ভেতরে এত মানুষ কেমন করে বাস করে এই অনুভব করে আমি পরোক্ষের পথ খুঁজি।
এই সদরঘাটে এককালে কত এসেছি। ‘স্টার’ নামের একটি সিনেমা হল ছিল। হলটির মুখোমুখি সরু রাস্তার উল্টোদিকে ‘মুন’ নামের আরেকটি সিনেমা হলও ছিল। প্রবেশ পথের পাশে ছিল ‘সাভার’ রেস্তোরাঁ। মোগলাই পরোটার জন্য বেশ নামডাক ছিল রেস্তোরাঁটির। উল্টোদিকে একটি প্রিন্টিং প্রেস ছিল, লেড’র অক্ষর দিয়ে দিয়ে পৃষ্ঠা সাজাতেন কম্পোজিটর। আর কিছু ফলের দোকান। এখন সেসব কিছুই নেই। চোখের সামনে সব ভেসে উঠল। মানুষের গা প্রায় ঠেলে ঠেলে এগুচ্ছি। ছোটমামা আমার সামনে, আমি তাঁর পেছনে, আমার পেছনে ভাইয়ের বন্ধু বাবু্, পাশাপাশি দুজন হাঁটা যায় না, আমাকে আগলে রাখার চেষ্টা করছে; আমার ভাই সবার সামনে থেকে প্রায় চিৎকার করে আমাদের আরও দ্রুত যেতে বলছে। ডিসেম্বরের সন্ধ্যা মানুষের প্রাচীর ভাঙতে ভাঙতে এখন প্রাক্তন। বুড়িগঙ্গায় রাত ন’টার লঞ্চ মানুষ পেয়ে ডগমগ করছে। আমরা চারজন লঞ্চ—উৎসবে অফুরন্ত উৎসাহের সঙ্গে যুক্ত হই।
ঠিক শীত না, শীত শীত। লঞ্চের ভেঁপু বেজে বেজে উঠছে। অন্তরে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে খুশি আর খুশি। ঘাট থেকে দড়ি আলগা হল, নোঙর উপরে উঠল, দেখি, আস্তে আস্তে লঞ্চ তীর ছেড়ে বুড়িগঙ্গার মধ্যভাগে এল। নদীর কালো জল তরঙ্গ পেয়ে উচ্ছ্বসিত হল। একটু পরেই আমাদের ডিনারের ডাক পড়ল।
বাবু খেতে খেতেই বলল, আজ রাতে আমরা চাঁদের গান শুনব। বাবুর এই বাসনা যে কতটা উথল, লঞ্চের ছাদে গিয়ে চকিতে টের পাই। উদাম আকাশ, বিস্তৃত কুয়াশা; না, কুয়াশা না, কুয়াশার মত; আবার হয়ত কুয়াশা; জানিনা, কেবল জানি, আমি সহসাই এক অপার্থিব ব্যঞ্জনাদীপ্ত আকাশের আদরে বিলীন হয়ে আছি। সেই নামহীন পাতলা, ভাঙ্গা ভাঙ্গা গুড়ি গুড়ি, কুয়াশার শরীর চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে রহস্যময় এক নিষ্পিষ্ট প্রভা, দেখি মাথার ওপর ঠিক মধ্য আকাশে পূর্ণ চাঁদ, স্থির, নিঃসঙ্গ ও মোহময়; অমন চাঁদ, চাঁদের অমন আঁধার মিশ্রিত আলো; যেন এক জাদুর আলো, জগতেরই সম্পদ; আমি এই রকম চাঁদের আলো, এই রকম জোছনা এই প্রথম দেখছি; আমি এই দেখে দেখে শিহরিত হচ্ছি আর ভাবছি, এই মগ্নতাধন্য জোছনার না—আলো—না—অন্ধকারের ভেতর কী আছে যে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এই মধ্যরাতে! নদীবক্ষের চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন, শুধু এই চাঁদ, এই আলো, আর এই আঁধার! আর কাটা কাটা বাতাস, বাতাসে জল থেকে উঠে আসা মিহি গুড়োর মত অজস্র কণা, ভেজা; আর, আর, আমার এই মগ্নমুগ্ধচৈতন্য যা এইমাত্র আমি প্রাপ্ত হলাম, কী আছে এর ভেতর? অচেনা কোন অখন্ড সুখ, না দুমড়ে মুচড়ে দেয়া কোনো বেদনা, বা দুটোই, আমি জানিনা!
বাবু ব্লু টুথ—এ গান ছেড়েছে, মান্না দে’র, ‘ও চাঁদ সামলে রাখো জোছনাকে’। তারপর অখিল বন্ধু ঘোষের, ‘সেদিন চাঁদের আলো চেয়েছিল জানতে ওর চেয়ে সুন্দর কেউ আছে কি, আমি তোমার কথা বলেছি’। তারপর, ‘চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙ্গেছে’; আমাদের সাথে ‘তুমি’ নেই কারো, তবুও বাজল, ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভাল, চাঁদ বুঝি তা জানে’, তারপর, বেগম আকতারের ‘জোছনা করেছে আড়ি, আসেনা আমার বাড়ি’। আমরা মাতাল হই। একের পর এক বেজে চলেছে চাঁদ নিয়ে যত গান। লঞ্চের ছাদে আমরা চারজন ছাড়া আর কেউ নেই! এইরকম চাঁদের গানের কুয়াশা—ভেজা জোছনার রাত আমাদের জীবনে আর কখনো আসেনি। মোটা দাগের বৈপরীত্য জল আর জোছনার, আলো আর আঁধারের, কিন্তু আজ সব মিলেমিশে একাকার!
ভোর তখন দূরে নয়, আমাদের লঞ্চ কীর্তনখোলার বুক চিড়ে চিড়ে ধীরে ধীরে এগুচ্ছে। পাতলা অন্ধকারের ওপারে বরিশাল শহরের লঞ্চ ঘাটে বাল্বের ম্লান আলো ফুটে আছে, রেলিঙয়ে ভর দিয়ে দেখছি। বেশ ক’জন মানুষ আমাদের লঞ্চের আগমনের দিকে তাকিয়ে আছে। উদাম আকাশ, দেখি, সারা দিগন্ত খুলে দিয়ে,আরো উদার—উদাম হয়েছে। চাঁদ আড়াল হয়েছে, সঙ্গে নিয়ে গেছে জোছনা, মনে হল, কীর্তনখোলার সঙ্গে জোছনা আড়ি করেছে।
একসঙ্গে, বরিশালের কীর্তনখোলার এই ঘাটে একদিন আবুল হাসানের সঙ্গে আসব বলে কথা ছিল। আমাদের কখনই আসা হয়নি।
যৌবন কথা রাখেনা, কথা রাখা না রাখায় যৌবনের মাথা ব্যথা নেই; চপল যৌবন, প্রাপ্তিতেই তার তৃপ্তি। হোক তা আনন্দের বা হোক তা বেদনার।
লং আইল্যান্ড, নিউইয়র্ক।
জুন ৯, ২০২৬
