মঙ্গল শোভাযাত্রা সম্প্রীতির গণউৎসব

সুব্রত বিশ্বাসঃ বাংলার ইতিহাস লোকধর্মের, লোক সংস্কৃতির। রাজরাজরাদের দর্প দাপটের বাইরের ইতিহাসে আছে মরমীয়া সম্প্রীতি। লোকায়ত জীবনের উঠোন জুড়ে আছে সমন্বয়ী সংস্কৃতির বিস্তার। আজ থেকে পাঁচশো বছর আগেই বাংলার কবি উচ্চারণ করেছিলেনসবার উপরে মানুষ সত্য ইসলামও এখানে তরবারির সাহায্যে আসেনি। পীর, ফকির, সুফি, দরবেশের হাত ধরে যে লোকায়ত ইসলাম, নিম্ন বর্গের হিন্দুও সেখানে গিয়েছে তার মন জুড়াতে। সত্য পীর এখানে সত্যনারায়ণ। জাতপাতের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহের নেতা চৈতন্যের ঘোষণা ছিলচন্ডালপি দ্বিজ শ্রেষ্ঠ তুর্কী শাসনকালে রামায়ণ, মহাভারতের অনুবাদ করেছেন মুসলমান কবি। শত আক্রমণেও বাঙালি তার সাহিত্য, সংস্কৃতির চর্চা বন্ধ রাখেনি। সময়ের বৃত্ত জুড়ে মানুষ পুড়ে সত্তা তার ভূমিষ্ঠ করে নতুন স্পন্দন। প্রবল আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে সে চর্যাপদে সান্ধ্য ভাষা বা আলো আঁধারির আশ্রয় নিয়েছে। অনেকেই হয়ত জানেন, বাংলা একটি অখন্ড স্বাধীন রাজ্য হিসেবে গড়ে ওঠে সামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহীর শাসনে। দিল্লী থেকে বহু মাইল দূরের দুর্গমতার জন্য বাংলা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে ওঠে। দিল্লীর উপনিবেশসুলভ আচরণের বিরুদ্ধে লড়াই তাই বাংলার রক্তে। মোগল সা¤্র্াজ্যের বিরুদ্ধে বারো ভুঁইয়ারা দুর্ভেদ্য একত্রিশ বছর লড়া্ই করেছে। ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যের বিরুদ্ধেও সর্বাধিক আত্মবলিদান তাই মাটিতে। দ্বিজাতিতত্ত্ব চাপানোর জন্য এই মাটিকেই বেছে নিতে হয়েছিল। দেশভাগের মর্মান্তিক বেদনা আজও বহন করছে বাংলা। আর্যাবর্ত দক্ষিণ ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদ বাঙালির সমাজ জীবনকে বেঁধে ফেলেছিল একসময়। সেই যুগসঞ্চিত অন্যায়ের বিরুদ্ধেই লালন থেকে চৈতন্য, অভিন্ন মানবরতনের সন্ধান করেছেন। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রোকেয়া, রবীন্দ্রনাথ প্রত্যেকেই অন্ধকারের উৎস থেকে আলোর সন্ধানে বিদ্রোহী। 

দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করে পদ্মা পাড়ের বাঙালি ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তন করেছিল। আমরা আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের ওই কালজয়ী বিজয়ের সূচনাকে খন্ডিত চোখে দেখতে চাই না। এই লড়াইয়ের ধারাবাহিকতাই একাত্তরের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ আশির দশকের শেষে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে সামরিক জান্তা। আহত চারুশিল্পীরা ঘোষণা করেন বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির মধ্যে যে সমন্বয়ী ধারা প্রবহমান মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকেই বাঙ্ময় করে তুলবেন তারা। কীভাবে হবে এই নিয়ে তারা যখন উদ্ভাবনী ভাবনায় মশগুল, হাতের সামনে পেয়ে গেলেন যশোহর জেলার চারুপীঠেরআনন্দ শোভাযাত্রা শুরুর বছর মঙ্গল শোভাযাত্রার নামও ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। পরে নাম পরিবর্তন হয়। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ফাইন আর্টস ডিপার্টমেন্টেকে বলা হয় চারুকলা। তারাই ¯্রষ্টা, প্রেরণা মৌলবাদের বিরোধিতায়। যদিও আবহমান বাংলার সমস্ত জনপদে চৈত্র সংক্রান্তি বর্ষবরণ নানা ধরনে হয়ে থাকে। ২০১৭ সাল থেকে কলকাতায় গাঙ্গুলিবাগান থেকে যাদবপুর পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষের পদচারণায় ভাস্বর হয়ে ওঠে এই সম্প্রীতির নাগরিক কার্নিভাল। পক্ষকাল ধরে ওয়ার্কশপ হয়। শিল্পীদের সাথে যোগ দেন সাধারণ মানুষ। 

বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই চোখরাঙানি আছে মৌলবাদের। ভারতের এবং পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু মৌলবাদের শক্তিও তাই ভালোভাবে নিচ্ছে না গণমানুষের এই মিলনের উৎসবকে। অস্ত্র নিয়ে প্রায় একই সময় যারা রামনবমীর মিছিল নামায়, মঙ্গল শোভাযাত্রার সম্প্রীতির লোকায়ত উপস্থাপনা তাদের ভালোলাগার কথা নয়। রাত জাগা আল্পনা, বিক্রমপুরের কাঠের ঘোড়া, বাংলার লক্ষ্মীপেঁচারাও যেন সেদিন বলে ওঠে এই মাটি বিদ্বেষের নয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা আজ কেবল বাংলাদেশের বা পশ্চিমবঙ্গের নয়, নানা জায়গায় হয়। জাতিসংঘের ইউনেস্কো বছর কয়েক আগে মঙ্গল শোভাযাত্রাকেঅধরা বিশ^ ঐতিহ্য ঘোষণা করেছে কাঁটাতারের ওপার বা এপার যেখানেই থাকি না কেন এটা বাংলারই গৌরব। সেই গৌরব মঙ্গল শোভাযাত্রায় গায়ে এবার বাংলাদেশের নতুন সরকার নতুন করে নখের অঁাচড় বসিয়েছে। 

মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা যদি শিকড়ের সন্ধান না করি তবে শুধু মিটিং মিছিল দিয়ে পারব না। আমার লালন, হাছন রাজা, বিজয় সরকার, ঝুমুর, রায়বেশে, কীর্তনের মুর্ছনা, বাউলের  একতারায় যে মানবপ্রেম থাকে, তাকে আয়ত্ত করতেই হবে। নতুন প্রকরণে ভাবতে হবে সাম্প্রদায়িকতার পরিসর নিমূর্ল করার জন্য। অপরিচয়ের দূরত্ব ঘোচাতে হবে। কারণ সম্প্রীতির ঘোষণা  আমাদের ফ্যাশন নয়। বুকের গহীন থেকেই সেই আকুতি বেরোতে হবে। ঢাকা আর কলকাতা এদিন যেন একসাথেই শিকড় খোঁজে। 

তবু প্রকৃতির নিয়মে ঋতুর বদল ঘটে, চৈত্র পার হয়ে আবার আসে অগ্নিস্নাত বৈশাখ। মৌলবাদের কালো মেঘ ভ্রম্নকুটি দেখায়, উৎসবের মেজাজ হয়তো ফিরে আসেনা তেমন। তবু হালখাতা আর মিষ্টিমুখের ডাক থেকে বঞ্চিত হবনা আমরা। দ্বিধাদ্বন্দ্বে দুলতে দুলতেএসো হে বৈশাখবলে কালবৈশাখীকে বরণ করে নিয়েই আমরা আরেকটি নতুন বঙ্গাব্দে পা রাখি, ভাবি, যা ভাঙা তাই ভাঙবে রে, যা রবে তাই থাক বাকি স্বপ্ন দেখি আঁধারকে আলোকিত করার প্রমিতি তাই মিলে যাবে একদিন।  ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ আমাদের মনে তেমনই নতুন করে আশার ভাষা জোগায়। অবশ্য সে আশা কুহকিনী কিনা তা তো সময়ই বলবে।

Related Posts